১৬-৯-২০২০
জোহর নামাজের প্রস্তুতি চলছে। ওজু-ইস্তেঞ্জা করে সবাই আস্তে আস্তে মসজিদের দিকে রওয়ানা হচ্ছে।
নির্ধারিত ইমাম সাহেবের পিছনে ইক্তেদা করে নামাজ পড়ছে সবাই। কিছুক্ষণের মধ্যে নামাজের ফরজিয়্যাত আদায় করে নিয়েছে মুসল্লিগণ। আলহামদুলিল্লাহ।
হঠাত ইমাম সাহেবের ব্যবহৃত মাউথ স্পিকার নিয়ে কোনোএকজন ছাত্র দাঁড়িয়ে যায় এবং বলতে শুরু করে, "মাদ্রাসায় ছাত্রদের হয়রানি বন্ধ করতে হবে।" "আনাস মাদানীকে মাদ্রাসা থেকে বহিস্কার করতে হবে।" তখনই মসজিদে অবস্থানরত ছাত্র মুসল্লীগণ সমস্বরে 'ঠিইইইক' বলে চিৎকার দিয়ে উঠে। এবং সাথে সাথে সবাই মাদ্রাসা মাঠের দিকে উত্তপ্ত বালির মত যেতে থাকে। (এখানে একটি কথা বলে রাখি। যখনই বক্তা ছাত্রটি স্পিকার নিয়ে দাঁড়িয়ে যায় তখন চার থেকে পাঁচজন ছাত্র তাকে হেফাজত বা শ্যাল্টারের জন্য দাঁড়িয়ে যায়। উদ্দেশ্য, যাতে দালাল কোনো ছাত্র তার ক্ষতি করতে না পারে।)
মাঠে অবস্থানরত ছাত্ররা "আনাস মাদানীকে মাদ্রাসা থেকে বহিস্কার করতে হবে" "ঠিইইক" "ঠিইইক" মিছিলে গরম করে দিচ্ছে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণ। কেউ মাদ্রাসা মাঠে, কেউ তো মাদ্রাসার বিভিন্ন বিল্ডিংয়ের ছাদে অবস্থান করছে।
শাহী গেইটের পার্শে একটি গাছের নীচে কাঠ-শামিয়ানাবিহীন মঞ্চ তৈরি করা হয়। সেখান থেকে দায়িত্বশীল ছাত্ররা একজন একজন করে বক্তৃতা দিতে থাকেন। এবং ছাত্রদেরকে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিতে থাকেন। মাঝে মধ্যে বিভিন্ন বিল্ডিংয়ে অবস্থানরত ছাত্রদেরকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, যেন তারাও মাঠে এসে সবার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে। কেউ তো ফোনে আন্দোলনের খবর প্রচার করছে, কেউ তো পিকচার-ভিডিও বার্তায়।
একটু পরপর দায়িত্বশীল ছাত্ররা আন্দোলনকারী ছাত্রদেরকে হুশিয়ার করে দিচ্ছেন, কোনো উস্তাদের গায়ে যেন কোনো ছাত্র হাত না দেয়। এটুকুই। কিন্তু, এরই মধ্যে অনেক ছাত্ররা কয়েকজন উস্তাদের রুম ভাংচুর শুরু করে দেয়। এদিকে মাইকে শুনা যাচ্ছে, "আমাদের আন্দোলন সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে। কোনো ভাংচুর হচ্ছে না।"
আমার জানা মতো, প্রথমে আনাস মাদানী হাদাহুল্লাহ- এর রুমে ততক্ষণে ভাঙচুর শুরু হয়ে যায়। উনার রুমের অধিকাংশ জিনিসপত্র নষ্ট করা হয়েছে। টাকা, ল্যাপটপ, আলমারি, কাপড়-চোপড়সহ আরো অনেককিছু! টাকা-পয়সা তো অনেক ছোট-বড় ছাত্রদের পকেটে ঢুকেছে। এরপর নাইবে মুহতামিম শেখ আহমদ সাহেবের রুমের দিকে ছাত্রদের মোড় ঘুরে। দায়িত্বশীল ছাত্রদের উদ্দেশ্য, উনার সাথে আলাপ করে ছাত্রদের দাবিগুলো মানাতে চেষ্টা করবে। তখন শেখ সাহেবের রুমের সামনে অবস্থানরত ছাত্ররা শেখ সাহেবের রুমের তালা ভাঙতে শুরু করে এমনকি সফলও হয়। সাথে হৈ-হুল্লোড়ের স্লোগান তো ছিলো। এরকম দু-একজন শিক্ষকের রুমের দিকে ছাত্রদের মোড় ঘুরে।
নুরুল ইসলাম সাদিক (জাদিদ সাহেব) এর রুমের আসবাবপত্র, খাট-পালঙ্ক নীচের পুকুরে ফেলে দেয়া হয়। অনেকের থেকে শুনেছি যে, তারা জাদিদ সাহেবের রুম ভেঙেছে তাঁর উপর ক্ষোভের কারণে। কারণ, শুনা গেছে উনি নাকি অনেক ছাত্রকে সীট দেন নি। আবার ঘুরিয়েছেনও।
এভাবে সারাদিন কেটে যায়। আসর পর থেকে মাইকে শুনা যাচ্ছে যে, শূরা সদস্যগণ মাদ্রাসায় আসছেন। তাঁরা ছাত্রদের দাবি নিয়ে আলাপ করবেন।
মাগরিব পরে জানানো হয় যে, শূরা সদস্যগণ (কয়েকজন) মাদ্রাসায় উপস্থিত হয়েছেন। এবং আন্দোলনের দাবি নিয়ে মিটিং করছেন। একটু পরে মিটিংয়ের সিদ্ধান্তের শোনানি হবে।
এরই মধ্যে শাহ আহমদ দিদার কাসেমী সাহেবের রুমের দিকে কিছু ছাত্ররা গমণ করে। সেখানে নাকি মঈনুদ্দিন রুহি নামক এক দালাল সারাদিন থেকে অবস্থান করছে। একথা শুনার পর ছাত্ররা দিদার সাহেবের রুম ভেঙে মঈনুদ্দিন রুহিকে উত্তম-মধ্যম দিয়ে অজ্ঞান করে দেয়। পরে তাকে কয়েকজনের মাধ্যমে সিএনজি যোগে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
রাত প্রায় ১০ঃ১৫মি. এর দিকে শেখ আহমদ সাহেবকে ছাত্ররা নিয়ে আসে। উনি ছাত্রদের পাঁচটি দাবি থেকে দুটি দাবির সিদ্ধান্ত শোনান। এবং বলেনঃ শনিবারে বাকি তিনটি দাবির শোনানি হবে।
১৭-০৯-২০২০
সকাল আনুমানিক সাড়ে নয়টা কি দশটা হবে। তখন মাদ্রাসার পাগলা ঘন্টা বেঁজে উঠে। এবং মাদ্রাসা মাঠ থেকে চিক চিৎকার শুনা যাচ্ছে। তখন ছাত্ররা মাঠের দিকে দৌড়াতে থাকে। আর রড, লাঠি যা পায় তা নিতে থাকে। সকলেই ভাবছে, হয়ত বাহির থেকে প্রশাসন হামলা শুরু করে দিয়েছে। পরে প্রচার হতে থাকে মাদ্রাসার মিটিং রুমে গোপন মিটিং বসেছে। এজন্য ছাত্ররা আবারো দ্বিতীয় দিনের মত আন্দোলন শুরু করে দেয়। দ্বিতীয় দিনটি ছিলো প্রথম দিনের চেয়ে আরো ভয়াবহ। সকলেরই দাবি আমাদের সকল দাবি যেন অনতিবিলম্বে মেনে নেয়া হয়। তা না হলে আন্দোলন চলমান থাকবে। এভাবে চলছে আন্দোলন।
আজও কয়েকজন উস্তাদের রুমে ভাংচুর হয়েছে। বৃদ্ধ উস্তাদগণ ভয়ে তটস্থ। ফোরক্বান সাহেব নামি একজন উস্তাদ তো হাতজোড় করে বলেছেনও, "আমাকে তোমরা বলো, আমি চলে যাই। তবুও তোমরা আমার জিনিসপত্রের কিছু করো না। আমি এখনো কিতাবের টাকা দেই নি"
এভাবে জোহর পর্যন্ত আন্দোলন চলমান ছিলো। জোহর পরে খাবার-দাবার, গোসল ইত্যাদি কাজের জন্য বিরতি দেয়া হয়।
মাগরিব পর। আস্তে আস্তে আন্দোলনে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবরের স্লোগানে বিল্ডিংগুলো কাঁপছে। দায়িত্বশীল ছাত্ররা একজন একজন করে বক্তৃতা দিচ্ছেন। প্রচলিত বাক্য দ্বারা স্লোগান দেয়া হচ্ছে।
শূরার সদস্যগণ অনেকেই মাদ্রাসায় এসে উপস্থিত হয়েছেন। মাগরিবের অনেক্ষণ পর মিটিং বসে। মিটিং চলাকালীন সময়ে ছাত্ররা স্লোগান, বস্তু দিয়ে বস্তুর আঘাত করা শুরু করে দেয়। যেন মিটিং রুমে ভয় বিরাজ করে। আর ছাত্রদের পক্ষে রায় বা সিদ্ধান্ত এসে যায়। তখন কিছু কিছু উগ্রমেজাজী ছাত্ররা শাহ আহমদ শফী সাহেবের রুমের দরজা ভাঙতে শুরু করে। উনার রুমের বারান্দার টানেলের গ্লাস ভাংতে শুরু করে। এমনকি এসির মেশিন কেউ কেউ ভাঙার চেষ্টা করে। যদিও কিছু কিছু ছাত্রের নিষেধে তারা আর ভাঙেনি।
পরে ঘোষণা আসে, একটু পর সিদ্ধান্ত শোনানো হবে। ছাত্ররা অপেক্ষমাণ। কি সিদ্ধান্ত হয়েছে তা শোনার জন্য।
অল্পক্ষণ পরেই শূরা সদস্যদের তিন থেকে চারজন সদস্য মাঠে এসে ছাত্রদের সমস্ত দাবি মেনে নেয়া হয় বলে লিখিত কাগজ পড়ে শোনান। এর মধ্যে অন্যতম লিখিত কথা ছিলো, শেখ শফী রহ.কে মুহতামিমের পদ থেকে সরিয়ে উপদেষ্টা বানানো হয়েছে। এবং নুরুল ইসলাম সাদিক বা জাদিদ সাহেবকে মাদ্রাসার সমস্ত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
(আরো কিছু কথা)
>মাদ্রাসায় আন্দোলন চলাকালীন সময়ে চতুর্দিকে পাহারার ব্যাবস্থা করা হয়। যেন প্রশাসনের কেউ মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে। তখন ছাত্রদের হাতে রড, লাঠি ইত্যাদি থাকাটাই স্বাভাবিক।
>মাইকে বলা হয়, প্রশাসনের কেউ যেন মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে।
>আন্দোলন চলাকালীন সময়ে শফী সাহেবের অবস্থার অবনতি ঘটে। আন্দোলন শেষ হবার সাথে সাথে উনাকে হাসপাতালে শিফট করা হয়।
>ছাত্রদের হাতে রড-লাঠি থাকার উদ্দেশ্য হচ্ছে, বাহির থেকে যদি প্রশাসনের আক্রমন আসে তাহলে প্রতিহত করা। কিছু ছাত্র তা থেকে ভিন্ন।
>আন্দোলন চলাকালীন সময়ে দায়িত্বশীল ছাত্ররা নিষেধ করার পরেও কিছু কিছু ছাত্ররা উল্টো কাজ করেছে।
সঠিকটা এখন বুঝলাম।
ReplyDeleteহুম
ReplyDelete